বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর শ্রমবাজার ‘লো হায়ার, লো ফায়ার’ বা ‘কম নিয়োগ, কম ছাঁটাই’ চক্রে আটকে আছে বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য জি৭ দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার গত বছরের তুলনায় ধীর হয়েছে। বাণিজ্য অস্থিরতার কারণে নিয়োগ ও ছাঁটাই পিছিয়ে দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে কর্মী মনোভাবেও ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে, তারা চাকরি পরিবর্তনে অনিচ্ছুক। এতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থান, বাণিজ্য ও করনীতি সম্পর্কিত অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কবিবাদ। খবর এফটি।
গত মে-জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বার্ষিক ভিত্তিতে কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যান্য জি৭ দেশে এ হার ছিল আরো কম, দশমিক ৪ শতাংশ। দুই পরিসংখ্যানই ২০২৪ সালের তুলনায় অনেক কম নতুন নিয়োগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ছাঁটাইয়ের পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোম্পানিগুলো কর্মী সংখ্যা ধরে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন নিয়োগের হারও কমিয়ে দিয়েছে। এমন এক সময় প্রবণতাগুলো দেখা যাচ্ছে, যখন ধারণা করা হচ্ছে শ্রমবাজারকে ব্যাপকভাবে পুনর্গঠন করবে এআই এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ।
এবারের গ্রীষ্মে নিয়োগ বৃদ্ধি প্রায় থেমে গেছে। এর মাঝে যুক্তরাষ্ট্রে জুনে বড় ধরনের ছাঁটাই দেখা গেছে। এ বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ সাইমন ম্যাকঅ্যাডাম বলেন, ‘কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ধীর হওয়া উন্নত অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল পয়েন্ট।’
প্রতিবেদন অনুসারে, জাপান বাদ দিয়ে হিসাব করলে কয়েক বছর ধরে জি৭ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমছে। বিশেষভাবে যুক্তরাজ্যে গত বছরে নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় দশমিক ৫ শতাংশ।
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল গত মাসে বলেছিলেন, ‘আপনি এখন একটি কম নিয়োগ, কম ছাঁটাই অর্থনীতিতে আছেন।’
ওই সময় তিনি আরো জানান, মার্কিন অর্থনীতি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে। কোম্পানিগুলো অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও বাজারের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করছে। এর ওপর ভিত্তি করে নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তারা।
শুধু নিয়োগ ও ছাঁটাই পিছিয়ে যাচ্ছে এমন নয়। নিয়োগদাতারা বলছেন, চাকরি পরিবর্তনেও আগ্রহী নন কর্মীরা। কারণ তাদের সামনে রয়েছে অনিশ্চয়তা। নিয়োগবিষয়ক ব্রিটিশ সংস্থা হেইসের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা জেমস হিলটনের মতে, নিয়োগদাতারা বেশি সতর্ক হওয়ায় প্রধান বাজারগুলোয় নতুন চাকরি কম হচ্ছে। অন্যদিকে চাকরি চাইতেও মানুষ দ্বিধা করছে। তিনি বলেন, ‘কোম্পানিগুলো নতুন নিয়োগে সময় নিচ্ছে ও ছোট আকারে বেতন বাড়াচ্ছে। একই সময়ে প্রার্থীরা চাকরির নিরাপত্তা, নমনীয় কাজের সুযোগ হারানো বা দীর্ঘ যাতায়াতের মুখোমুখি হওয়ার কথা ভেবে সতর্ক রয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ করে ক্যারিয়ার শুরু করতে চাইছেন এমন তরুণদের জন্য স্থবির শ্রমবাজার সমস্যা সৃষ্টি করছে। এ স্থবিরতার মধ্যেও ছাঁটাইয়ের হার খুব বেশি বিস্তৃত হয়নি। ইউরোজোনের অনেক দেশে বেকারত্ব রেকর্ড নিম্নে রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানিতে বেকারত্ব সামান্য বেড়েছে। একই দেশগুলোয় কিছু নিয়োগকারী শ্রম সংকটে থাকার কথা জানিয়েছেন।
বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারাও শ্রমবাজারের স্থবিরতার কারণ নিয়ে স্পষ্ট নন। তাদের সামনে রয়েছে একাধিক প্রশ্ন। বাজারে চাকরির চাহিদা কমছে? নাকি পর্যাপ্ত কর্মী পাওয়া কঠিন হচ্ছে?
মার্কিন ফেডের গভর্নরদের মধ্যে আগেই সুদহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন ক্রিস্টোফার ওয়ালার ও মিশেল বোম্যান। তারা মনে করেন, শ্রমবাজারে উল্লেখযোগ্য দুর্বলতার প্রমাণ রয়েছে। মিশেল বোম্যান গত সপ্তাহে বলেছিলেন, ‘শ্রমবাজার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলে যেতে পারে ভেবে আমি উদ্বিগ্ন। এক ধাক্কায় হঠাৎ করে পরিস্থিতি আরো খারাপ দিকে চলে যেতে পারে।’
তবে শিকাগো ফেডের প্রেসিডেন্ট অস্টান গুলসবি সতর্ক করে বলেন, ‘নিয়মিত বেতনভুক্ত চাকরির কম বৃদ্ধিই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সতর্কবার্তা নয়। বেকারত্ব এখনো ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। দুর্বল চাহিদা নয়, এর কারণ হতে পারে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি ও বেবি বুমারদের অবসর গ্রহণ।’
লিঙ্কডইনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উন্নত অর্থনীতিগুলোয় এ প্রফেশনাল সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ব্যবহারকারীদের চাকরি পরিবর্তনের হার কমছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় নতুন চাকরির হিস্যা কভিড-পূর্ববর্তী স্তরের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কম। ফ্রান্সে এ হার আরো কম এবং জার্মানিতে প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে।
লিঙ্কডইনের আমেরিকা অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ কোরি কান্টেঙ্গা বলেন, ‘অনেক দেশ এখনো মহামারী-পরবর্তী প্রভাবের ধাক্কা সহ্য করছে। ব্যাপক হারে নিয়োগ হয়েছিল। এরপর সুদহার বাড়ানোয় কর্মসংস্থান বাজারে মন্দা তৈরি হয়েছে।’
অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের লেবার অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক স্টেফানো স্কারপেট্টা বলেন, ‘দীর্ঘ সময় শ্রমবাজারে ধীর প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ অনিশ্চয়তা রয়েছে। তা সত্ত্বেও কর্মসংস্থান হার এখনো উচ্চ এবং শ্রম সংকট বিস্তৃত থাকা বিস্ময়কর।’
তার মতে, চাকরি পরিবর্তন কম হওয়ার অন্যতম কারণ জনসংখ্যাগত, যেখানে বয়স, অভিবাসন ও জনসংখ্যার কাঠামো যুক্ত। বয়স্করা সাধারণত এক জায়গায় থিতু হয়ে যান, ভৌগোলিকভাবে কম স্থানান্তর হন। এছাড়া নতুন চাকরিতে উচ্চ বেতন চাওয়া কারো কারো জন্য সমস্যাজনক। ইউরোপের সব দেশই বয়সী জনসংখ্যা বাড়ছে, যা শ্রমবাজারে কর্মী চলাচল কমিয়ে দিচ্ছে।